মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া মানেই কি পাইলস?

মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া মানেই কি পাইলস?

মলত্যাগের সময় বা মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া সাধারণ একটি উপসর্গ। তবে আমাদের সমাজে এ নিয়ে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার একমাত্র কারণ বোধহয় পাইলস বা অর্শরোগ। চিকিৎসকের চেম্বারে এসেও অনেক রোগী শুরুতেই নিজের রোগ নিজে নির্ণয় করে বলেন, তিনি পাইলস সমস্যায় ভুগছেন। এ ধারণাটি আংশিক সত্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ পাইলস ছাড়াও মলদ্বারের বহুবিধ জটিল এবং মারাত্মক কারণে রক্তপাত হতে পারে। আমাদের সমাজে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে, মলের সঙ্গে রক্ত গেলেই সেটি নিশ্চিতভাবে পাইলস বা অর্শ রোগ। এটি আংশিক সত্য হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণের পেছনে আরও বহুবিধ ও জটিল কারণ থাকতে পারে। সাধারণ মানুষের মাঝে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করার জন্য আমার চিকিৎসা জীবনের একটি বাস্তব কেস স্টাডি এখানে তুলে ধরছি, যা থেকে এই সমস্যার গভীরতা ও সঠিক রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব।

ষাট বছর বয়সী এক গৃহিণী প্রায় দুই বছর ধরে মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি একজন জেনারেল ফিজিশিয়ানকে দেখালে, চিকিৎসক তাকে পাইলস অপারেশন করানোর পরামর্শ দেন। ভদ্রমহিলা একটি ক্লিনিকে অপারেশন করালেন বটে, কিন্তু তার মলদ্বারের ব্যথা ও রক্ত যাওয়া বন্ধ হলো না। অপারেশনের তিন মাস পর তিনি আমার শরণাপন্ন হন। উনার সঙ্গে থাকা একটি পূর্ববর্তী বায়োপসি রিপোর্টে ক্যানসার শনাক্ত হয়নি উল্লেখ ছিল। কিন্তু আমি পরীক্ষা করে উনার মলদ্বারে একটি টিউমার দেখতে পাই, যা দেখতে হুবহু ক্যানসারের মতোই ছিল। রোগটি সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় বায়োপসি করা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। তবে উনার সীমিত অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে আমি উনাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করি। কিন্তু তিনি সেখানে না গিয়ে ঢাকার অন্য একটি ক্লিনিকে যান এবং দুর্ভাগ্যবশত এবারও সেখানকার বায়োপসি রিপোর্টে ক্যানসার ধরা পড়ল না। তবে দ্বিতীয়বার দেখার পর আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এটি ক্যানসার ছাড়া আর কিছুই নয়। যেহেতু মাংস পরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই আমি রোগীকে আবারও বায়োপসি করার পরামর্শ দিলাম। এবার আমি নিজেই বিশেষ ফরসেপের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে মাংসের নমুনা সংগ্রহ করলাম। অবশেষে ল্যাবরেটরি রিপোর্টে ক্যানসারের উপস্থিতি নিশ্চিত হলো। পূর্ববর্তী পরীক্ষাগুলোয় ক্যানসার ধরা না পড়ার পেছনে সাধারণত তিনটি প্রধান কারণ থাকে- যথাযথ স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ না করা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং উপযুক্ত যন্ত্র বা সঠিক বায়োপসি ফরসেপের অনুপস্থিতি। যা-ই হোক, পরবর্তী সময় সেই রোগীর অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং তিনি এখন সুস্থ ও ক্যানসারমুক্ত আছেন।

এই ঘটনাটি থেকে আমাদের সবার অনেক বড় একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। মলদ্বারে ব্যথা বা রক্ত যাওয়ার কারণ শুধুই পাইলস নয়; বরং এনাল ফিশার, পলিপ, ইনফেকশন, আলসার এবং ক্যানসারের মতো জটিল কারণেও এমনটি হতে পারে। তাই এই উপসর্গকে সামান্য পাইলস মনে করে অবহেলা করা একদমই উচিত নয়। লজ্জা বা ভয় পেয়ে ঘরে বসে না থেকে, লক্ষণ দেখামাত্রই একজন বিশেষজ্ঞ কলোরেক্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হোন এবং সঠিক পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করুন।


কলোরেক্টাল অ্যান্ড পেলভিক ফ্লোর সার্জন এবং সহকারী অধ্যাপক, কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগ, 
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা।
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ভবন-৬, রোড-২
ধানমন্ডি, ঢাকা। ০১৭১১৩৭৯৭২৪, ০৯৬৬৬৭৮৭৮০১


***********
লেখক ও প্রকাশনা সংক্রান্ত নোটিশ

আপনি যদি আমাদের ওয়েবসাইটে আপনার লেখা, গবেষণামূলক নিবন্ধ, স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য বা অন্য কোনো কনটেন্ট প্রকাশ করতে চান, তাহলে অনুগ্রহ করে ইমেইলের মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

এছাড়া, আমাদের ওয়েবসাইটে ইতোমধ্যে প্রকাশিত আপনার কোনো লেখা, তথ্য বা কনটেন্ট সংশোধন, হালনাগাদ কিংবা অপসারণ (Delete) করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার (URL) লিংকসহ আমাদের ইমেইল করুন। আপনার অনুরোধ যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইমেইল: whereindoctor@gmail.com

Total Pageviews